মহালয়ার দিনেই শুরু কলকাতার পুজো পরিকল্পনা: উত্তর থেকে দক্ষিণ, ২০২৬-এর সেরা দুর্গাপুজো ও ক্লাব পরিক্রমার সম্পূর্ণ গাইড

Table of Contents

কলকাতার পুজো দেখা এক ধরনের শারীরিক পরীক্ষাও বটে। পা ব্যথা, গলা ভাঙা, তবু পরের প্যান্ডেলের লাইনে দাঁড়ানোর উৎসাহ কমে না। সপ্তমীর রাতে উত্তরের গলি, অষ্টমীর ভোরে দক্ষিণের থিম, নবমীর রাতে মাঝের ভিড় — এই ঘুরে বেড়ানোকে বাঙালি আদর করে বলে ‘ঠাকুর দেখা’। এ বছর মহালয়া ১০ অক্টোবর, আর পুজো ১৬ থেকে ২০ অক্টোবরের পঞ্জিকা অনুযায়ী। হাতে এখনও কয়েকটা দিন আছে, তাই এখনই পরিকল্পনা শুরু করার সময়। এই গাইড সেই পরিকল্পনাকে একটু গুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা: কোন অঞ্চলে কী দেখবেন, কীভাবে রুট সাজাবেন, কখন বেরোবেন, কীভাবে ভিড়কে এড়াবেন, আর কী খাবেন।

শুরুতেই একটি কথা

পুজো কমিটিগুলির থিম, শিল্পী ও মণ্ডপের বিবরণ সাধারণত মহালয়ার পর থেকে ষষ্ঠীর আগে পর্যন্ত ঘোষণা হতে থাকে। এখনও অনেক কমিটি তাদের থিম প্রকাশ করেনি। তাই এই লেখায় আমরা মূলত অঞ্চলভিত্তিক পরিচিত ঐতিহ্য ও সুপরিচিত কমিটির নাম দিচ্ছি। চলতি বছরের নির্দিষ্ট থিম ও সময়সূচির জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটির ঘোষণা দেখে নেওয়াই ভাল। কোনও পুজো ‘সেরা’, তা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কে কোন পুজো বেশি পছন্দ করবেন, তা ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার।

কলকাতার পুজোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাস শহরের নিজের ইতিহাসের মতোই পুরনো। প্রচলিত মতে, বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার ১৬১০ সালের কাছাকাছি সময়ে এখানে পুজো শুরু করেছিল, যা এই শহরের প্রাচীনতম পুজোগুলির একটি বলে ধরা হয়। এরপর আঠারো শতকে পলাশির যুদ্ধের পর শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭ সালে তাঁর বাড়িতে বিরাট আকারে পুজো করেন বলে জনশ্রুতি। ব্রিটিশ আমলে এই বনেদি পুজো সামাজিক প্রতিপত্তি ও মেলামেশার মঞ্চ হয়ে ওঠে।

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে পুজো ধীরে ধীরে পরিবারের গণ্ডি ছেড়ে পাড়ার হাতে আসতে থাকে। কলকাতায় সর্বজনীন পুজোর একটি পরিচিত সূচনা-বিন্দু ১৯১০ সালে উত্তর কলকাতার বাগবাজারে, যা পরে বাগবাজার সর্বজনীন নামে পরিচিত হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এই সর্বজনীন মণ্ডপগুলিই বহু সময় জমায়েত ও সংগঠনের জায়গা ছিল। দেশভাগের পর উদ্বাস্তু কলোনিতে পুজো নতুন আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

বিশ শতকের শেষ দিক থেকে আসে থিমের যুগ। এখন মণ্ডপ শুধু প্রতিমা রাখার জায়গা নয়, একটি শিল্পকর্ম। কোনও থিমে পুরনো কলকাতা, কোনও থিমে লোকশিল্প, কোনওটিতে সামাজিক বার্তা। শিল্পী, স্থপতি, আলোকশিল্পী ও প্রযুক্তিবিদ একসঙ্গে কাজ করেন। এই ধারা আজ কলকাতার পুজোর সবচেয়ে বড় চরিত্র।

উত্তর কলকাতা: ঠাকুরদালান ও পাড়ার আবেগ

উত্তর কলকাতার পুজোর ঐতিহ্য সবচেয়ে প্রাচীন, আর এখানকার ক্লাবগুলির পিছনে রয়েছে পাড়ার প্রজন্মের পর প্রজন্মের আবেগ।

শোভাবাজার রাজবাড়ি

১৭৫৭ সালের ঐতিহ্য বহনকারী এই বাড়ির পুজোকে কলকাতার পুজোর ইতিহাসের গোড়ার অধ্যায় বলা হয়। বিশাল ঠাকুরদালান, ঐতিহ্যবাহী আচার, সন্ধিপুজো ও ভোগ এখানে দেখার মতো। ভিড় তুলনামূলক কম, তবে নিরাপত্তা ও প্রবেশের নিয়ম আগে জেনে নেওয়া ভাল।

কুমারটুলি সর্বজনীন ও কুমোরটুলি পার্ক

কুমোরটুলি মৃৎশিল্পীদের পাড়া, তাই এখানকার পুজোয় প্রতিমার কাজ বিশেষ গুরুত্ব পায়। পুজোর আগে ও পরে এই পাড়া ঘুরে দেখার আলাদা আকর্ষণ আছে।

বাগবাজার সর্বজনীন

সর্বজনীন পুজোর ধারার অন্যতম পরিচিত নাম। ঐতিহ্য মেনে প্রতিমা ও সাজের জন্য এই পুজো সুপরিচিত। বাগবাজারের ঘাট, বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরি, এবং আশপাশের পুরনো বাড়ির সংস্কৃতি এই পুজোর পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে।

সিমলা ব্যায়াম সমিতি, হাতিবাগান সর্বজনীন, কলেজ স্কোয়ার ও আহিরীটোলা

এই কমিটিগুলি বহু বছর ধরে বিপুল দর্শকসমাগমের জন্য পরিচিত। ষষ্ঠী থেকে অষ্টমীর রাতে এই অঞ্চলে গাড়ি নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব, তাই মেট্রো বা হাঁটাই ভরসা। গিরিশ পার্ক, মহাত্মা গান্ধী রোড ও শোভাবাজার-সুতানুটি মেট্রো স্টেশন ধরে এই অঞ্চলে যাওয়া যায়, তবে মেট্রোর পুজো-সময়সূচি কর্তৃপক্ষের ঘোষণা দেখে নিন।

মধ্য কলকাতা: শিয়ালদহ থেকে পার্ক সার্কাস

সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার

১৯৩৬ সালে শুরু বলে পরিচিত এই পুজো শিয়ালদহ অঞ্চলের প্রধান আকর্ষণ। বড় বাজেটের থিম পুজোর আলোচনায় সাধারণত এর নাম আসে। ছুটির দিন বা অষ্টমী-নবমীর রাতে এখানে বিপুল ভিড় হয়।

ম্যাডক্স স্কোয়ার ও পার্ক সার্কাস অঞ্চল

মধ্য কলকাতার মিশ্র সংস্কৃতির প্রতিফলন এই এলাকার পুজোয় দেখা যায়। পার্ক সার্কাস, মৌলালি, রিপন স্ট্রিট ও আশপাশের অঞ্চলে বাঙালি, অবাঙালি, মুসলিম, খ্রিস্টান — সব সম্প্রদায়ের মানুষ পুজোর সময় ভিড় জমান, আর পুজো ঘিরে খাবারের দোকানগুলি রাতভর খোলা থাকে।

দক্ষিণ কলকাতা: থিম, আলো ও নতুন ভাবনা

দক্ষিণ কলকাতা সাধারণত থিমভিত্তিক মণ্ডপ ও বড় বাজেটের জন্য আলোচিত।

একডালিয়া এভারগ্রিন, সিংহী পার্ক ও হিন্দুস্তান পার্ক

গোলপার্ক, বালিগঞ্জ ও গড়িয়াহাট অঞ্চলের নামী কমিটিগুলির মধ্যে এগুলি নিয়মিত উল্লেখযোগ্য।

সুরুচি সংঘ, ত্রিধারা সম্মিলনী, মুদিয়ালি ক্লাব ও ৯৫ পল্লি

নিউ আলিপুর, বালিগঞ্জ, কালীঘাট ও টালিগঞ্জ অঞ্চলের এই ক্লাবগুলি কলকাতার পুজো আলোচনায় বারবার ফিরে আসে। এখানকার শিল্পকর্ম ও আলোকসজ্জা দেখতে ভিড় বেশি হয়।

বেহালা, ঢাকুরিয়া, যাদবপুর ও জোধপুর পার্ক

শহরের দক্ষিণ প্রান্তে বহু পুরনো ও নামী কমিটি রয়েছে। বেহালা নতুন দল, বোসপুকুর শীতলা মন্দির, নাকতলা উদয়ন সংঘ, জোধপুর পার্ক — প্রতিটির নিজস্ব দর্শকগোষ্ঠী আছে।

বনেদি বাড়ির পুজো: ঐতিহ্যের শিকড়

কলকাতার আধুনিক থিম পুজোর পাশাপাশি পুরনো পরিবারের পুজোগুলি এখনও জীবিত। এগুলি সাধারণত সীমিত আকারে, কিন্তু ঐতিহ্যে ভরপুর।

বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজো প্রচলিত মতে সবচেয়ে প্রাচীনগুলির একটি। শোভাবাজার রাজবাড়ি ও আশপাশের দেব পরিবারের শাখাগুলির বিভিন্ন বাড়ির পুজো একসঙ্গে দেখা সম্ভব। কুমারটুলি, জোড়াসাঁকো, হাটখোলা, পাথুরিয়াঘাটা ও বাগবাজার অঞ্চলের একাধিক বনেদি বাড়ি পুজো করে, যেখানে সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত সকালবেলায় সরাসরি আচার, সন্ধিপুজো ও ভোগের পরম্পরা চোখে পড়ে। অনেক বাড়িতে ভিড় সামলানোর জন্য নির্দিষ্ট সময়ে প্রবেশের ব্যবস্থা থাকে, তাই আগে থেকে জেনে যাওয়া ভাল।

শহরতলি ও নতুন কলকাতা

বিধাননগর বা সল্টলেকের এফডি ব্লক, সিএ ব্লক, জিডি ব্লক-সহ বিভিন্ন ব্লকের পুজো, দমদম পার্ক ভারত চক্র, লেক টাউন অঞ্চলের পুজো, রাজারহাট-নিউটাউনের নতুন কমিটিগুলি — এগুলি শহরের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অংশের পুজোর প্রধান আকর্ষণ। এখানে পথ চওড়া, পার্কিংয়ের সুবিধা তুলনামূলক বেশি, ভিড় সামলানোও সহজ।

তিনটি নমুনা রুট

রুট ১: উত্তর কলকাতার ঐতিহ্য

সকালে শোভাবাজার রাজবাড়ির আচার দেখে বেরোন। এরপর কুমারটুলি পার্ক ও কুমোরটুলির শিল্পীপাড়া, তারপর আহিরীটোলা ও বাগবাজার। দুপুরে কোনও পুরনো দোকানে খাওয়া সেরে বিকেলে সিমলা ব্যায়াম সমিতি ও হাতিবাগান। সন্ধ্যায় ভিড় বাড়লে কলেজ স্কোয়ার না গিয়ে পরের দিন সকালে ফিরে আসাই ভাল।

রুট ২: মধ্য কলকাতা ও সেন্ট্রাল

শিয়ালদহে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার দিয়ে শুরু করুন, তারপর পার্ক সার্কাস ও ম্যাডক্স স্কোয়ার। শেষে রাতে পার্ক স্ট্রিট বা এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে আলোকসজ্জা দেখে খাওয়াদাওয়া।

রুট ৩: দক্ষিণ কলকাতার থিম সফর

একডালিয়া এভারগ্রিন দিয়ে শুরু করে সিংহী পার্ক, হিন্দুস্তান পার্ক, সুরুচি সংঘ, ত্রিধারা সম্মিলনী ও মুদিয়ালি। রাতে ভিড় বাড়ার আগে সন্ধ্যায় শুরু করলে সুবিধা। যাদবপুর ও বেহালার দিকের পুজো আলাদা দিনের জন্য রাখুন।

পুজোর পাঁচ দিনের পরিকল্পনা: দিন ধরে ধরে

ষষ্ঠী

প্রতিমার বোধন ও আমন্ত্রণের দিন। অনেক মণ্ডপ ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এই দিনটি তুলনামূলক শান্ত, তাই বনেদি বাড়ি ও ঐতিহ্যবাহী পুজো দেখার জন্য আদর্শ। থিম পুজোর ভিড় এখনও তেমন শুরু হয় না।

সপ্তমী

কলাবউ স্নান ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা। সকালবেলা বনেদি বাড়িতে এই আচার দেখা যায়। দুপুর পর্যন্ত রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা, বিকেল থেকে ভিড় বাড়ে। দক্ষিণ কলকাতার বড় থিম পুজোগুলি এই দিন সকাল বা দুপুরে দেখে নিতে পারলে সবচেয়ে ভাল।

অষ্টমী

অঞ্জলি, কুমারী পুজো আর সন্ধিপুজো। সকালে মণ্ডপে অঞ্জলি দিতে আসা মানুষের ভিড়, আর রাতে ঠাকুর দেখতে বেরোনো মানুষের বিপুল স্রোত। এই দিন ভোরে বা বিকেলে ঘোরা সবচেয়ে সুবিধাজনক, রাতের দিকে ভিড় এড়ানোই ভাল।

নবমী

মহানবমীর রাত কলকাতার সবচেয়ে ভিড়ের রাত। বড় কমিটির সামনে লম্বা লাইন হয়। যদি ঘোরার পরিকল্পনা করেন, ছোট ও মাঝারি কমিটিগুলি দেখুন, যেখানে প্রতিমা ও শিল্পকর্ম সমান সুন্দর, কিন্তু ভিড় কম।

দশমী

বিজয়া। সকালে সিঁদুর খেলা, বিকেল-সন্ধ্যায় বিসর্জন। ঘাটে ঘাটে ঢাকের বোল ও ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনি। বিসর্জনের রাস্তায় যান নিয়ন্ত্রণ থাকে, ঘাটে যেতে হলে পুলিশের নির্দেশ মেনে চলুন। কার্নিভাল হলে তা আলাদা অভিজ্ঞতা, তবে আসন ও প্রবেশের নিয়ম সরকারি ঘোষণা থেকে জেনে নিন।

পুজোর কেনাকাটা কোথায়

পুজোর বাজার কলকাতার আরেক আকর্ষণ। গড়িয়াহাট, নিউ মার্কেট, এসপ্ল্যানেড, হাতিবাগান, বড়বাজার ও শ্যামবাজার বা বাগবাজার অঞ্চলের দোকানে নতুন কাপড়, জুতো, গয়না ও সাজসজ্জার সামগ্রী মেলে। কলেজ স্ট্রিটে পুজোসংখ্যা ও নতুন বইয়ের ভিড়। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানে পুজো স্পেশাল মিষ্টি। ভিড় এড়াতে মহালয়ার পর পরই কেনাকাটা সেরে ফেলা ভাল, কারণ ষষ্ঠী যত এগোয় তত দোকানে ভিড় ও দাম বাড়ে।

পরিবেশবান্ধব ঠাকুর দেখা

এ বছর অনেক কমিটি প্লাস্টিক ও থার্মোকলের ব্যবহার কমানোর কথা বলছে। দর্শক হিসেবে আপনিও ভূমিকা নিতে পারেন: নিজের জলের বোতল ও ব্যাগ সঙ্গে রাখুন, প্লাস্টিকের প্যাকেট মণ্ডপের কাছে ফেলবেন না, বিসর্জনের সময় ঘাটে প্লাস্টিক বা ফুলের মালা ফেলার বদলে নির্দিষ্ট বিনে দিন। উৎসব যত বড়, দূষণের দায়িত্বও তত সবার।

কখন বেরোবেন: ভিড় এড়ানোর কৌশল

ষষ্ঠী ও সপ্তমীর সকাল বা দুপুরে সাধারণত ভিড় কম থাকে। অষ্টমীর সকালে অঞ্জলির পর ভিড় বাড়ে আর অষ্টমী ও নবমীর রাত সবচেয়ে ভিড়ের। দশমীর দিন বিসর্জনের সময় রাস্তাঘাটে বিঘ্ন হয়, আবার বিসর্জনের পরে কার্নিভালের আয়োজনও হয়ে থাকে। কার্নিভালের সঠিক তারিখ ও স্থান প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী জানা যাবে।

ঠাকুর দেখার আগে জেনে রাখুন: পুজোর কয়েকটি আচার

মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে কিছু আচার চোখে পড়বে, যার অর্থ জানা থাকলে দেখার আনন্দ বাড়ে। সপ্তমীর সকালে কলাবউ স্নানের সময় কলাগাছের সঙ্গে আটটি গাছের পাতা একত্র করে নবপত্রিকা তৈরি হয়, যা দেবীর শস্যরূপ বলে মানা হয়। অষ্টমীতে কুমারী পুজো হয়, যার ঐতিহ্য বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০১ সালে চালু করেছিলেন বলে প্রচলিত। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে সন্ধিপুজোয় একশো আটটি প্রদীপ জ্বালানো হয়, যা পুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বলে ধরা হয়। নবমীর সন্ধ্যায় অনেক মণ্ডপে ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতা হয়। দশমীতে দেবীকে বিদায় জানানোর আগে মহিলারা সিঁদুর খেলায় মাতেন, আর শেষে প্রতিমা বিসর্জনের পর বড়দের প্রণাম, ছোটদের আশীর্বাদ ও কোলাকুলি।

বেরোনোর আগের চেকলিস্ট

মোবাইলে পুরো চার্জ ও একটি পাওয়ার ব্যাংক নিন। আরামদায়ক, বন্ধ জুতো পরুন, কারণ ভিড়ে খোলা চটি পায়ে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। ছোট ব্যাগ রাখুন, ভারী ব্যাগ ভিড়ে ক্লান্তিকর। নিজের জলের বোতল, সামান্য শুকনো খাবার ও দরকারি ওষুধ সঙ্গে রাখুন। দলের সবার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট মিলনস্থল ঠিক করুন, কারণ ভিড়ে ফোনের নেটওয়ার্ক অনেক সময় কাজ করে না। বাচ্চাদের হাতে পরিবারের ফোন নম্বর লেখা কাগজ বা ব্যান্ড দিয়ে দিন।

পরিবহণ

মেট্রো পুজোর দিনে সবচেয়ে সুবিধাজনক। সাধারণত পুজোর কয়েকটি দিন মেট্রো কর্তৃপক্ষ বিশেষ সময়সূচি ঘোষণা করে, তবে চলতি বছরের সূচি আগে দেখে নিন। বাসও চলে, তবে রাস্তায় যান নিয়ন্ত্রণের কারণে রুট বদল হতে পারে। অ্যাপ-ক্যাব ও ট্যাক্সি পাওয়া কঠিন ও ভাড়া বেশি হতে পারে। নিজের গাড়ি নিয়ে বেরোনোর পরিকল্পনা থাকলে পুলিশের ট্রাফিক নির্দেশিকা দেখুন, কারণ অনেক রাস্তায় পুজোর সময় গাড়ি ঢোকা নিষিদ্ধ থাকে। সবচেয়ে ভাল উপায় নির্দিষ্ট এলাকায় গাড়ি রেখে হেঁটে ঘোরা।

খাওয়াদাওয়া: পুজোর স্বাদ

কলকাতার পুজো মানে খাওয়ার উৎসবও। ঘুগনি, রোল, ফুচকা, ফিশ ফ্রাই, চপ-মুড়ি, কষা মাংস, বিরিয়ানি, মিষ্টি দই ও সন্দেশ — তালিকা অফুরন্ত। বনেদি বাড়ির ভোগ বা খিচুড়ি প্রসাদ পাওয়া গেলে মিস করবেন না। বাইরের খাবারে স্বাস্থ্য-সচেতনতার কথাও মাথায় রাখুন, বিশেষ করে রাস্তার খাবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখে বেছে নিন।

নিরাপত্তা ও সৌজন্য

ভিড়ের মধ্যে ছোট বাচ্চা ও বয়স্কদের হাত ছাড়বেন না। প্রবেশ ও প্রস্থানের দিক নির্দেশনা ও পুলিশ-স্বেচ্ছাসেবকদের কথা মেনে চলুন। মণ্ডপে ঢোকার সময় ধাক্কাধাক্কি বা লাইন ভাঙা এড়িয়ে চলুন। মোবাইল ও মানিব্যাগ সাবধানে রাখুন, কারণ ভিড়ে পকেটমারির ঝুঁকি থাকে। জরুরি অবস্থার নম্বর (পুলিশ ১০০, অ্যাম্বুলেন্স ১০২/১০৮) সঙ্গে রাখুন।

বিশেষ প্রয়োজনের মানুষদের জন্য

অনেক কমিটি এখন বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও গর্ভবতী দর্শকদের জন্য আলাদা প্রবেশের ব্যবস্থা রাখে। যাওয়ার আগে কমিটির সোশ্যাল মিডিয়া বা ঘোষণা দেখে এই ব্যবস্থা আছে কিনা জেনে নিন। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য সকালের দিকে যাওয়া ভাল।

ফটোগ্রাফির পরামর্শ

প্রতিমা ও শিল্পীর কাজের ছবি তোলার আগে নিয়ম দেখে নিন। কিছু মণ্ডপে ফ্ল্যাশ বা ট্রাইপড নিষিদ্ধ। ভোরবেলা বা দুপুরে ভিড় কম থাকলে ভাল ছবি তোলা যায়। অন্যের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

একটি বাজেট ধারণা

পুজো ঘোরা প্রায় বিনামূল্যে, কারণ মণ্ডপে প্রবেশের টিকিট নেই। খরচ হয় যাতায়াত, খাওয়াদাওয়া ও কেনাকাটায়। মেট্রো ও বাসে ঘুরলে দিনপ্রতি খরচ কম রাখা যায়। ক্যাব বা গাড়িতে ঘুরলে, বিশেষ করে রাতের দিকে, খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে।

ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে যা এড়িয়ে চলবেন

লাইন ভেঙে ঢোকার চেষ্টা, মণ্ডপের সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে সেলফি তোলা যাতে অন্যের চলার পথ আটকায়, বাচ্চাদের ভিড়ের মধ্যে একা ছেড়ে দেওয়া, রাস্তায় প্লাস্টিক বা খাবারের মোড়ক ফেলা, আর অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ করা, এই কাজগুলি এড়িয়ে চলুন। বনেদি বাড়ি বা মন্দির-সংলগ্ন পুজোয় পোশাক ও আচরণে সৌজন্য বজায় রাখুন।

কলকাতার পুজো নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন

কলকাতার কোন পুজো সবচেয়ে বিখ্যাত? কোনও একটি পুজোকে ‘সবচেয়ে বিখ্যাত’ বলা কঠিন। ঐতিহ্যের দিক থেকে শোভাবাজার ও বড়িশা, সর্বজনীনের দিক থেকে বাগবাজার, আর থিমের দিক থেকে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার বা দক্ষিণ কলকাতার নামী ক্লাবগুলির নাম বেশি শোনা যায়।

কখন গেলে ভিড় কম? ষষ্ঠী ও সপ্তমীর সকাল, এবং কাজের দিনের দুপুর।

মেট্রো কি রাতভর চলে? পুজোর কিছু দিন বিশেষ সময়সূচিতে মেট্রো রাত পর্যন্ত চলে, তবে নির্দিষ্ট দিন ও সময় মেট্রো কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী দেখুন।

বাচ্চাদের নিয়ে কোথায় ভাল? বনেদি বাড়ির পুজো ও শহরতলির বড় পার্কের কাছাকাছি কমিটিগুলিতে ভিড় সামলানো সহজ।

বাইরে থেকে এলে কোথায় থাকবেন? উত্তর কলকাতায় ঐতিহ্যের কাছাকাছি, মধ্য কলকাতায় সুবিধাজনক যাতায়াতের জন্য, আর দক্ষিণে আধুনিক হোটেলের জন্য। পুজোর সময় আগে থেকে বুক করুন।

শহরের আরেক রূপ: ভোরের কলকাতা

অনেকে মনে করেন পুজোর আসল কলকাতা দেখা যায় ভোরবেলা। ষষ্ঠী থেকে নবমী, ভোরে যখন ভিড় নেই, ঢাকের শব্দ থেমে এসেছে, মণ্ডপের আলো নিভে এসেছে, তখন বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে শুরু হয় দিনের প্রথম আরতি। গঙ্গার ঘাটে ধুপের গন্ধ, কুমোরটুলির গলিতে শিল্পীদের শেষ মুহূর্তের কাজ, চায়ের দোকানে প্রথম আড্ডা। এই কলকাতা আলাদা। একদিন সকাল সকাল বেরিয়ে এই রূপটি দেখে নিন।

শেষ কথা

কলকাতার পুজো শুধু প্যান্ডেল বা থিমের গল্প নয়, এটি পাড়ার আড্ডা, পুরনো বন্ধুদের দেখা আর ঢাকের তালে মিশে যাওয়ার গল্প। এ বছর পরিকল্পনা শুরু করুন মহালয়া থেকেই, কিন্তু হিসেবের খাতার বাইরে একটু ভেসেও যান। হঠাৎ কোনও গলিতে ঢুকে পড়া ছোট্ট পুজোই অনেক সময় সবচেয়ে মনে থেকে যায়।

আগামীকাল, ১১ অক্টোবর, আমরা ফিরব উৎসবের রাজনীতি ও সরকারি উদ্যোগের বিশ্লেষণ নিয়ে।

Related Posts

বাংলার দুর্গোৎসব ২০২৬: স্বাধীনতার পর প্রথমবার এমন পরিবর্তনের দাবি কতটা সত্য?

“স্বাধীনতার পর প্রথমবার” দাবিটি কতটা সত্য? দুর্গাপুজোয় সরকারি অনুদান, পরিকাঠামো, নিরাপত্তা, পর্যটন ও বিভিন্ন সরকারের ভূমিকার তথ্যনির্ভর তুলনামূলক আলোচনা।

Continue reading
আগমনী ২০২৬-এ বিজেপির বার্তা: নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ থেকে বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্ব— দুর্গাপুজো ঘিরে প্রত্যাশা, বক্তব্য ও রাজনৈতিক সমীকরণ

দুর্গাপুজো ঘিরে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ ও বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্বের বার্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রাজনীতি এবং বাংলার রাজনীতিতে দুর্গোৎসবের গুরুত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ।

Continue reading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *