মহালয়া ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গের ২৩ জেলার দুর্গাপুজো পরিক্রমা—বিখ্যাত ক্লাব, ঐতিহ্য ও দর্শনীয় মণ্ডপের তালিকা

Table of Contents

দুর্গাপুজো মানেই অনেকের কাছে কলকাতার প্যান্ডেল হপিং। কিন্তু বাংলার দুর্গোৎসবের আসল বিস্তার তার চেয়ে অনেক বড়। প্রত্যন্ত গ্রামের মাটির দালান থেকে রাজবাড়ির ঠাকুরদালান, চা-বাগানের ক্লাব থেকে পাহাড়ের শহর, শিল্পাঞ্চলের বিশাল প্যান্ডেল থেকে সীমান্তের ছোট্ট বারোয়ারি — প্রতিটি জেলার পুজোর নিজস্ব গল্প, নিজস্ব রীতি, নিজস্ব মেজাজ। মহালয়ার দিনে রইল পশ্চিমবঙ্গের ২৩ জেলার পুজোর একটি বিস্তৃত পরিক্রমা। কোন জেলায় কোন ঐতিহ্য, কী দেখার মতো, কীভাবে যাবেন এবং যাওয়ার আগে কী মনে রাখবেন, সবই এখানে।

পরিক্রমার আগে জেনে নিন

এই তালিকা সম্পূর্ণ নয়। প্রতিটি জেলায় শত শত, কোথাও হাজারের বেশি পুজো হয়। এখানে কেবল সুপরিচিত ঐতিহ্য, জনপ্রিয় অঞ্চল এবং পরিচিত পুজোর উল্লেখ আছে। থিম, মণ্ডপের নকশা, শিল্পী ও সময়সূচি প্রতি বছর বদলায়, তাই যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটির সর্বশেষ ঘোষণা দেখে নেওয়াই ভাল। ঐতিহাসিক সাল ও রাজবাড়ির কাহিনি স্থানীয় প্রচলিত মত অনুযায়ী লেখা, কোথাও কোথাও ইতিহাসবিদদের মত আলাদা হতে পারে।

আরেকটি কথা: এখানে পুজোকে ‘সেরা’ বা ‘সবচেয়ে বড়’ বলে কোনও র‍্যাঙ্কিং করা হয়নি। কোন পুজো কার ভাল লাগে তা একান্তই ব্যক্তিগত। এই লেখার উদ্দেশ্য আপনাকে পরিকল্পনা করতে সাহায্য করা, ফতোয়া দেওয়া নয়।

দক্ষিণবঙ্গ

কলকাতা

রাজ্যের রাজধানীর পুজো মোটামুটি দুই ধারায় বিভক্ত: বনেদি বাড়ির পুজো ও সর্বজনীন ক্লাব পুজো। শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো (প্রচলিত মতে ১৭৫৭ সালে নবকৃষ্ণ দেবের হাতে শুরু) শহরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোকে অনেকে সবচেয়ে প্রাচীনগুলির একটি বলে মনে করেন। ক্লাবের দিকে উত্তর কলকাতায় বাগবাজার, কুমারটুলি, সিমলা ব্যায়াম সমিতি, আর দক্ষিণে একডালিয়া এভারগ্রিন, সুরুচি সংঘ ও ত্রিধারা সম্মিলনীর মতো নাম নিয়মিত আলোচনায় থাকে। কীভাবে যাবেন: মেট্রো ও বাস সহজ মাধ্যম। বিস্তারিত গাইড আমাদের পরবর্তী পোস্টে।

উত্তর ২৪ পরগনা

এই জেলা শহরতলি, শিল্পাঞ্চল ও গ্রামীণ ছোঁয়া মিলিয়ে বিচিত্র। বিধাননগর বা সল্টলেকের এফডি ব্লক, সিএ ব্লক ও আশপাশের ক্লাবগুলি থিম ও আলোকসজ্জার জন্য পরিচিত। দমদম, ব্যারাকপুর, টিটাগড়, খড়দহ ও ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে বহু পুরনো বারোয়ারি পুজো আছে, যেখানে জুটমিলের শ্রমিক পরিবারগুলির অবদান বড়। বারাসত, বসিরহাট ও বনগাঁর পুজোয় আঞ্চলিক রঙ বেশি। কীভাবে যাবেন: শিয়ালদহ থেকে লোকাল ট্রেনে সহজেই। মনে রাখবেন, ষষ্ঠী থেকে অষ্টমীর রাতে ট্রেনে ভিড় বাড়ে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনা

কলকাতার দক্ষিণ লাগোয়া এই জেলা বিস্তৃত। বারুইপুর, সোনারপুর, রাজপুর, জয়নগর-মজিলপুর, ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ ও সুন্দরবন-সংলগ্ন অঞ্চলে পুজোর চরিত্র স্থান অনুযায়ী বদলায়। শহরতলিতে প্রতিযোগিতামূলক থিম পুজো দেখা যায়, আর দূর গ্রামাঞ্চলে সরল, ঐতিহ্যনির্ভর পুজো। সুন্দরবনের গ্রামে দুর্গাপুজোর সঙ্গে বনবিবির পুজোর লোকবিশ্বাসও মিশে থাকে। কীভাবে যাবেন: শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা বা বাসে।

হাওড়া

নদীর ওপারের এই শিল্পশহরের নিজস্ব পুজোর ঐতিহ্য আছে। আন্দুল রাজবাড়ির পুজো ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত, বালি ও শিবপুরের ক্লাবগুলি দীর্ঘদিনের নিয়মিত আয়োজক। হাওড়ার জনপ্রিয় একাধিক সর্বজনীন কমিটি থিম ও আলোকসজ্জায় আলাদা ছাপ রাখে। শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন বা বেলুড় মঠের কাছে পুজো দেখার আগে পরে ঘুরে আসা যায়। কীভাবে যাবেন: হাওড়া স্টেশন, মেট্রো, লঞ্চ বা বাস।

হুগলি

বাংলার সর্বজনীন পুজোর ইতিহাসে হুগলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত মতে ১৭৯০ সালে গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু মিলে প্রথম ‘বারো-ইয়ারি’ বা বারোয়ারি পুজো শুরু করেন, যা থেকে সর্বজনীন পুজোর ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর, বাঁশবেড়িয়া ও চন্দননগরের পুজো উল্লেখযোগ্য। চন্দননগর আলোকসজ্জার জন্য বিখ্যাত, বিশেষ করে জগদ্ধাত্রী পুজোয়, তবে দুর্গাপুজোতেও সেখানকার আলোর কাজ দেখতে বহু মানুষ আসেন। কীভাবে যাবেন: হাওড়া-ব্যান্ডেল শাখার ট্রেনে।

নদিয়া

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি ও মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঐতিহ্য নদিয়ার পুজোর গৌরব। কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির মাটির পুতুল ও প্রতিমা শিল্প সারা দেশে পরিচিত, তাই এখানকার প্রতিমা-নির্মাণ ঘুরে দেখা পুজো-পর্যটনের একটি আলাদা অধ্যায়। শান্তিপুরের তাঁত ও নবদ্বীপের বৈষ্ণব ঐতিহ্যের পাশাপাশি পুজোর আয়োজন থাকে। কল্যাণী ও রানাঘাট অঞ্চলে ক্লাব পুজোর বড় আয়োজন দেখা যায়। কীভাবে যাবেন: শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর লোকাল।

মুর্শিদাবাদ

নবাবি আমলের ইতিহাসের জন্য পরিচিত এই জেলায় কাশিমবাজার রাজবাড়ির পুজো দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করে। বহরমপুর, জিয়াগঞ্জ ও আজিমগঞ্জের পুরনো পুজো ও বনেদি বাড়ির আয়োজন আলাদা করে দেখার মতো। জেলার সাংস্কৃতিক মিশ্রণ, মুর্শিদাবাদের রেশম শিল্প ও হাজারদুয়ারির ঐতিহ্য পুজো-ভ্রমণকে একটি ঐতিহাসিক মাত্রা দেয়। কীভাবে যাবেন: শিয়ালদহ থেকে লালগোলা বা হাজারদুয়ার এক্সপ্রেসে বহরমপুর।

পূর্ব বর্ধমান

বর্ধমান শহরের রাজ-ঐতিহ্য, কালনা ও কাটোয়ার পুরনো পুজো এই জেলার বিশেষত্ব। কালনার একশো আটটি শিবমন্দির ও রাজবাড়ির ঐতিহ্যের কারণে পুজোর সঙ্গে স্থাপত্য দেখারও সুযোগ মেলে। কৃষিপ্রধান জেলা হওয়ায় অনেক গ্রামীণ পুজোয় মেলার আমেজও থাকে। কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে বর্ধমান মেইন বা কর্ড লাইনে দ্রুত ট্রেন।

পশ্চিম বর্ধমান

দুর্গাপুর ও আসানসোলের শিল্পাঞ্চলে বিশাল বাজেটের ক্লাব পুজো দেখা যায়, যেখানে বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিক পরিবার একসঙ্গে পুজোয় অংশ নেন। ইস্পাত ও কয়লাখনি অঞ্চলের পুজো তাই মিশ্র সংস্কৃতির প্রতিফলন। দুর্গাপুরে এবং আসানসোলে বড় থিম পুজো ও আলোকসজ্জা এখন নিয়মিত আকর্ষণ। কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে একাধিক ট্রেন, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সড়কপথে।

বীরভূম

গ্রামীণ বাংলার ঘ্রাণ এখানে সবচেয়ে বেশি। বোলপুর-শান্তিনিকেতন অঞ্চল, সিউড়ি, রামপুরহাট ও নানুরের আশপাশে ছোট-বড় নানা পুজো হয়। তারাপীঠের কাছাকাছি অঞ্চলে সাধনার ঐতিহ্য পুজোর পরিবেশে একটি আলাদা ছোঁয়া আনে। শান্তিনিকেতন-সংলগ্ন এলাকায় শারদোৎসবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকসংগীতও পুজো-ভ্রমণের অংশ হতে পারে। কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস বা বিশ্বভারতী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার।

বাঁকুড়া

বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী দেবীর পুজো এই জেলার সবচেয়ে প্রাচীন ও সুপরিচিত ঐতিহ্য। মল্লরাজাদের আমল থেকে এই পুজোর কথা বলা হয়, প্রচলিত বিশ্বাসে এর বয়স হাজার বছরের কাছাকাছি, যদিও সঠিক সাল নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ আছে। বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দির, দলমাদল কামান ও বালুচরি শাড়ির ঐতিহ্য পুজোর সফরকে সমৃদ্ধ করে। কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে আরণ্যক বা রূপসী বাংলা এক্সপ্রেসে বিষ্ণুপুর, সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা।

পুরুলিয়া

লালমাটির দেশ পুরুলিয়ায় পুজোর সঙ্গে লোকসংস্কৃতির নিবিড় যোগ। ছৌ নাচ ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত, আর শারদোৎসবের সময় নানা অনুষ্ঠানে ছৌ নাচ দেখার সুযোগ মেলে। ঝালদা, রঘুনাথপুর, বলরামপুর ও পুরুলিয়া শহরে ক্লাব পুজো হয়। অযোধ্যা পাহাড় ও মাইথন-সংলগ্ন এলাকায় ভ্রমণের সুযোগও আছে। কীভাবে যাবেন: হাওড়া বা শালিমার থেকে ট্রেনে।

পশ্চিম মেদিনীপুর

মেদিনীপুর শহর, খড়্গপুর, ঘাটাল ও নারাজোলের রাজ-ঐতিহ্য এই জেলার পরিচয়। খড়্গপুরের রেলশহরের পুজোয় বিপুল ভিড় হয়, আর আইআইটি-র ক্যাম্পাস অঞ্চলেও পুজোর আলাদা পরিবেশ থাকে। ঘাটালের বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষ বছরের নানা কষ্টের মাঝে পুজোর আনন্দ খোঁজেন। কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে খড়্গপুর বা মেদিনীপুর লোকাল, দূরপাল্লার ট্রেনও পাওয়া যায়।

পূর্ব মেদিনীপুর

মহিষাদল রাজবাড়ির পুজো ও তমলুকের ঐতিহ্য এখানকার প্রধান আকর্ষণ। তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরের কাছাকাছি অঞ্চলও পুজোয় সরগরম থাকে। হলদিয়ার শিল্পাঞ্চলে বড় ক্লাব পুজো, আর কাঁথি, দিঘা ও মন্দারমণির উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের হাওয়ায় পুজো দেখা এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে তমলুক বা কাঁথি লোকাল, দিঘার ট্রেন ও বাস।

ঝাড়গ্রাম

জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি ও সবুজ প্রকৃতির মধ্যে পুজোর অভিজ্ঞতা শহরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো এবং চিল্কিগড়ের কনক দুর্গা মন্দিরের ঐতিহ্য এই জেলার পরিচয়ের অংশ। শহরের বাইরের বনাঞ্চলে সাঁওতাল ও অন্য জনজাতির উৎসবের ছোঁয়াও দেখা যায়। কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে ট্রেনে ঝাড়গ্রাম, সময় প্রায় চার ঘণ্টা।

উত্তরবঙ্গ

জলপাইগুড়ি

তিস্তা-করলার তীরের এই শহর ও ডুয়ার্স অঞ্চলে পুজোর আলাদা আমেজ। জলপাইগুড়ি শহরে বড় সর্বজনীন কমিটি ছাড়াও রায়কত রাজ-ঐতিহ্যের স্মৃতি রয়েছে। ময়নাগুড়ি, মালবাজার ও ডুয়ার্সের চা-বাগান অঞ্চলে পুজো স্থানীয় সমাজের ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। পুজোর পাশাপাশি গরুমারা বা চাপড়ামারী বনাঞ্চলে ঘুরে আসা যায়। কীভাবে যাবেন: জলপাইগুড়ি রোড বা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন হয়ে।

আলিপুরদুয়ার

ডুয়ার্সের প্রবেশদ্বার এই জেলা ২০১৪ সালে নতুন জেলা হিসেবে গঠিত। চা-বাগান ও বনাঞ্চল ঘেরা এখানকার পুজোয় স্থানীয় সমাজের সব স্তরের অংশগ্রহণ চোখে পড়ে। শহর আলিপুরদুয়ারের পাশাপাশি জয়গাঁ, ফালাকাটা ও কুমারগ্রাম অঞ্চলে ক্লাব পুজো হয়। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান ও বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প কাছাকাছি। কীভাবে যাবেন: আলিপুরদুয়ার জংশনে ট্রেন।

কোচবিহার

রাজ-আমলের ঐতিহ্যে ভরা কোচবিহারে রাজবাড়ি ও মদনমোহন মন্দির-সংলগ্ন অঞ্চলের পুজোর রীতি আজও স্মরণ করা হয়। কোচবিহারের রাজপ্রাসাদ নিজেই পুজো-ভ্রমণের এক বড় আকর্ষণ। শহরে বেশ কয়েকটি বড় ক্লাব ও সর্বজনীন কমিটি পুজো করে। উত্তরবঙ্গের এই অংশে ভাওয়াইয়া গানের ঐতিহ্য পুজোর সন্ধ্যাকে আলাদা মাত্রা দেয়। কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে নিউ কোচবিহার স্টেশনে সরাসরি ট্রেন আছে।

দার্জিলিং

সমতলের শিলিগুড়ি শহরের বড় ক্লাব পুজো এবং পাহাড়ের দার্জিলিং, কার্শিয়াং ও মিরিক — একই জেলায় দুই ভিন্ন পরিবেশ। পাহাড়ে নেপালি ভাষাভাষী সমাজের বড় উৎসব দশাইন একই সময়ে পালিত হয়, ফলে সমতল ও পাহাড়ের সংস্কৃতির মিলন ঘটে। শিলিগুড়িতে থিম ও আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা বছর বছর বাড়ছে। কীভাবে যাবেন: নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন, বাগডোগরা বিমানবন্দর।

কালিম্পং

২০১৭ সালে নতুন জেলা হিসেবে গঠিত এই পাহাড়ি জেলায় দুর্গাপুজো ও দশাইন পাশাপাশি পালিত হয়। ছোট পরিসরে হলেও আন্তরিকতা ও সাংস্কৃতিক মিশ্রণ এখানকার বিশেষত্ব। পাহাড়ের পথ ও আবহাওয়ার কারণে এখানে যাতায়াতের পরিকল্পনা আগে থেকে করা ভাল। কীভাবে যাবেন: নিউ জলপাইগুড়ি থেকে সড়কপথে।

উত্তর দিনাজপুর

রায়গঞ্জ, ইসলামপুর, কালিয়াগঞ্জ ও চোপড়া অঞ্চলে পুজো আয়োজিত হয়। রায়গঞ্জের বড় ক্লাব পুজো জেলার প্রধান আকর্ষণ। জেলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, রাজবংশী সংস্কৃতি ও আশপাশের কুলিক পাখিরালয়ের মতো প্রাকৃতিক আকর্ষণ পুজো-ভ্রমণকে সমৃদ্ধ করে। কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে রায়গঞ্জ বা কালিয়াগঞ্জ স্টেশন, সড়কপথও আছে।

দক্ষিণ দিনাজপুর

বালুরঘাট ও গঙ্গারামপুর এই জেলার প্রধান শহর। সীমান্ত-সংলগ্ন এই জেলায় পুজোর সঙ্গে স্থানীয় লোকজীবনের গভীর সংযোগ দেখা যায়। বালুরঘাটের বড় ক্লাব ও সর্বজনীন পুজোর ঐতিহ্য আছে। পুজোর সময় জেলায় যাতায়াতের ব্যবস্থা আগে থেকে ঠিক করে নিন। কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে নির্দিষ্ট কিছু ট্রেন ও সড়কপথ আছে, সময় বেশি লাগে।

মালদা

ইংরেজবাজার ও ওল্ড মালদার পুরনো পুজো, আম ও রেশমের জন্য বিখ্যাত জেলায় বহু ঐতিহ্যবাহী পুজো রয়েছে। গৌড় ও পান্ডুয়ার ঐতিহাসিক স্থাপত্য, আদিনা মসজিদ ও অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভ পুজোর সঙ্গে ঘুরে দেখার মতো। মালদা শহরে বিভিন্ন কমিটি থিম নিয়ে পুজো করে। কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে মালদা টাউন স্টেশনে একাধিক ট্রেন।

জেলা ঘুরে পুজো দেখার তিনটি নমুনা পরিকল্পনা

ক. কলকাতার কাছাকাছি এক দিনের ঘোরা: হুগলি-হাওড়া সফর

সকালে হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে চুঁচুড়া বা চন্দননগর যান। সকালের আলোয় চন্দননগরের আলোকসজ্জার ঢাকা মণ্ডপ ও পুরনো ফরাসি পাড়ার রাস্তা ঘুরে দেখুন। দুপুরে বাঁশবেড়িয়া বা শ্রীরামপুর হয়ে হাওড়ার আন্দুল-বালির পুজো। সন্ধ্যায় শিবপুর বা বালি ফিরে নদীর ধারে বসে চা। এই পরিকল্পনায় ভিড় তুলনামূলক কম, ট্রেনের যাতায়াত সহজ।

খ. দুই রাতের ঐতিহাসিক সফর: বিষ্ণুপুর ও বাঁকুড়া

ষষ্ঠীর ভোরে হাওড়া থেকে ট্রেনে বিষ্ণুপুর। মৃন্ময়ী মন্দিরে দেবীদর্শন, তারপর টেরাকোটা মন্দির ও দলমাদল কামান। দ্বিতীয় দিন বাঁকুড়া শহর ও আশপাশের গ্রামের পুজো, বালুচরি তাঁতশিল্পীর কারখানা ও বাঁকুড়ার পোড়ামাটির ঘোড়া। তৃতীয় দিন সকালে ফেরা। পুজোর সময় হোটেল আগে থেকে বুক করা জরুরি।

গ. উত্তরবঙ্গের তিন রাত: শিলিগুড়ি, ডুয়ার্স ও কোচবিহার

নিউ জলপাইগুড়িতে নেমে শিলিগুড়ির বড় ক্লাব পুজো দেখে ডুয়ার্সের দিকে যাত্রা। জলপাইগুড়ি বা মালবাজারের পুজো ও বনাঞ্চলের আবহ, তারপর কোচবিহার রাজবাড়ি ও মদনমোহন মন্দির। পাহাড়ে যেতে চাইলে দার্জিলিং বা মিরিকে দশাইনের আমেজ দেখা যায়। উত্তরবঙ্গের সফরে আবহাওয়া ও সড়কপথের অবস্থা আগে দেখে নিন।

জেলার পুজো নিয়ে কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গে জেলার সংখ্যা কত? রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী বর্তমানে ২৩টি জেলা, যার মধ্যে সর্বশেষ নতুন জেলাগুলি আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম বর্ধমান ও পূর্ব বর্ধমান। ভবিষ্যতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হলে সংখ্যা বদলাতে পারে।

সর্বজনীন বা বারোয়ারি পুজো কী? যে পুজো একটি পরিবারের বদলে পাড়া বা সমাজের সবার উদ্যোগে ও চাঁদায় হয়, তাকেই সর্বজনীন বা বারোয়ারি পুজো বলে। বাংলার এই ধারার সূচনা নিয়ে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী হুগলির গুপ্তিপাড়ার ভূমিকা বড়।

বনেদি বাড়ির পুজো কী? পুরনো জমিদার, রাজা বা ধনী পরিবারের বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যে যে পুজো হয়, তাকে বনেদি বাড়ির পুজো বলা হয়। এখানে রীতিনীতি, ভোগ ও প্রতিমার গড়ন সাধারণত বহু যুগ ধরে একইরকম থাকে।

জেলার পুজোয় ভিড় কেমন? কলকাতার তুলনায় সাধারণত কম, তবে শিল্পাঞ্চল ও জেলা সদরের বড় ক্লাবে অষ্টমী-নবমীর রাতে ভিড় বেশ হয়।

পুজো পরিক্রমায় বেরোনোর আগে: দরকারি পরামর্শ

পরিকল্পনা আগে থেকে করুন

দূরের জেলায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে ট্রেনের টিকিট ও হোটেল আগে থেকে বুক করুন। পুজোর সময় বিশেষ করে বিষ্ণুপুর, দিঘা, মুর্শিদাবাদ, শান্তিনিকেতন ও উত্তরবঙ্গের পর্যটনকেন্দ্রে ঘর পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে।

নিরাপত্তা ও সৌজন্য

ভিড়ের জায়গায় নির্দেশিকা মেনে চলুন, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ মনে রাখুন। গ্রামীণ বা মন্দির-সংলগ্ন পুজোয় ছবি তোলার আগে অনুমতি চেয়ে নিন। পুরোহিত ও আয়োজকদের কাজে বিঘ্ন ঘটাবেন না।

পরিবেশ

মণ্ডপের আশেপাশে প্লাস্টিক ফেলবেন না। নিজের জলের বোতল সঙ্গে রাখুন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করুন।

স্থানীয় অর্থনীতিকে সমর্থন

জেলার পুজোয় গেলে স্থানীয় খাবারের দোকান, হস্তশিল্পী ও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কেনাকাটা করুন। বিষ্ণুপুরের বালুচরি ও টেরাকোটা, শান্তিপুরের তাঁত, কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, মুর্শিদাবাদের রেশম — এই সবই বাংলার ঐতিহ্যের অংশ।

আবহাওয়া

আশ্বিনে বৃষ্টির সম্ভাবনা থেকেই যায়। ছাতা বা রেনকোট সঙ্গে রাখুন, বিশেষ করে উপকূলীয় ও উত্তরবঙ্গের অঞ্চলে যাওয়ার সময়।

পুজো ও জেলার শিল্পীদের জীবন

জেলার পুজোর আলোচনায় একটি বিষয় প্রায়ই বাদ পড়ে যায়: যাঁরা পুজোটা বানান তাঁদের কথা। কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি, নদিয়ার শান্তিপুর, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর, মেদিনীপুরের গ্রাম, এমনকি পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রতিমা-শিল্পী, ঢাকি, সাজ-শিল্পী ও আলোকশিল্পীরা বছরের বড় একটি আয় এই সময়ের ওপর নির্ভর করেন। অনেক ঢাকি পরিবার দূর জেলা থেকে কলকাতা বা শহরের মণ্ডপে আসেন, আবার শহর থেকে শিল্পীরা জেলার পুজোর কাজ নিয়ে যান। জেলার পুজো দেখতে গেলে এই মানুষগুলির সঙ্গে কথা বলার, তাঁদের কাজ দেখার এবং ন্যায্য মূল্যে তাঁদের শিল্পসামগ্রী কেনার সুযোগ ছাড়বেন না। এতেই পুজো সত্যিকারের সর্বজনীন হয়ে ওঠে।

জেলা-সফরের খরচের মোটামুটি ধারণা

জেলার পুজো ঘোরার খরচ নির্ভর করে গন্তব্য, যাতায়াত ও থাকার ধরনের ওপর। কলকাতার কাছাকাছি হুগলি, হাওড়া বা নদিয়ায় লোকাল ট্রেনে ঘুরলে খরচ খুবই কম। বিষ্ণুপুর, শান্তিনিকেতন বা মুর্শিদাবাদের মতো মাঝারি দূরত্বে ট্রেন ও এক-দুই রাতের হোটেল ধরে খরচ কিছুটা বাড়ে, আর পুজোর সময় হোটেলের ভাড়াও বাড়তি হয়। উত্তরবঙ্গ, পাহাড় বা ডুয়ার্সের সফরে দূরপাল্লার ট্রেন বা বিমান, গাড়ি ভাড়া ও থাকার খরচ মিলিয়ে বাজেট অনেক বেড়ে যায়। নির্দিষ্ট অঙ্ক বছর ও সময় অনুযায়ী বদলায়, তাই পরিকল্পনার সময় টিকিট ও হোটেলের সর্বশেষ দাম মিলিয়ে নিন।

বাংলার প্রতিটি জেলার পুজো কেন আলাদা

এই পরিক্রমা থেকে একটি জিনিস স্পষ্ট: বাংলার দুর্গাপুজো একরঙা নয়। রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে যে আভিজাত্য, ক্লাবের প্যান্ডেলে সেই উচ্ছ্বাস, আর গ্রামের মাটির দালানে সেই আন্তরিকতা — এই সবই বাংলার দুর্গোৎসবের অংশ। পাহাড়ে দশাইন, জঙ্গলমহলে লোকসংস্কৃতি, শিল্পাঞ্চলে মিশ্র সমাজ, উপকূলে সমুদ্রের হাওয়া, সীমান্তে স্থানীয় ঐতিহ্য — বৈচিত্র্যের মধ্যেই এই উৎসবের শক্তি।

পরের পোস্টে আমরা ফিরব কলকাতায়, যেখানে উত্তর থেকে দক্ষিণ প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরার সম্পূর্ণ গাইড থাকবে। আর আপনার জেলার কোনও বিশেষ পুজোর কথা এই তালিকায় না থাকলে নিচে মন্তব্যে জানান। আমরা পরবর্তী হালনাগাদে যোগ করার চেষ্টা করব।

Related Posts

বাংলার দুর্গোৎসব ২০২৬: স্বাধীনতার পর প্রথমবার এমন পরিবর্তনের দাবি কতটা সত্য?

“স্বাধীনতার পর প্রথমবার” দাবিটি কতটা সত্য? দুর্গাপুজোয় সরকারি অনুদান, পরিকাঠামো, নিরাপত্তা, পর্যটন ও বিভিন্ন সরকারের ভূমিকার তথ্যনির্ভর তুলনামূলক আলোচনা।

Continue reading
আগমনী ২০২৬-এ বিজেপির বার্তা: নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ থেকে বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্ব— দুর্গাপুজো ঘিরে প্রত্যাশা, বক্তব্য ও রাজনৈতিক সমীকরণ

দুর্গাপুজো ঘিরে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ ও বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্বের বার্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রাজনীতি এবং বাংলার রাজনীতিতে দুর্গোৎসবের গুরুত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ।

Continue reading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *